প্রকাশের সময়: Wednesday, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:১৮ am প্রিন্ট এর তারিখঃ ,

রংপুরে একের পর এক সংঘর্ষ, হামলা ও হত্যার হুমকি: প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় বাড়ছে আতঙ্ক

প্রকাশের সময়: Wednesday, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:১৮ am

রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীরে দীর্ঘদিনের জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে একের পর এক সংঘর্ষ, হামলা, রক্তপাত ও হত্যার হুমকির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময়মতো হস্তক্ষেপ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। ফলে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রোববার বিকেলে পুরোনো বিরোধ ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহিনুর বেগম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কয়েকজনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শাহিনুর বেগমের সৎ ভাই-বোন, ভগ্নিপতিসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। আহতদের কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রংপুরের পাগলাপীর মহাদেবপুর পশ্চিমপাড়ায় প্রবাসী নওশের আলম সুমনের মসজিদের জন্য কেনা জমিসহ অন্যান্য জমি নিয়ে শাহিনুর বেগম ও তার পক্ষের লোকজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে এর আগেও একাধিকবার হামলা, সংঘর্ষ, মামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, আদালতের মাধ্যমে জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই বিরোধ আরও তীব্র হয়। আদালতের নোটিশ পাওয়ার পর রাতে বাড়িতে প্রবেশ করে হামলার অভিযোগও রয়েছে। পরে এ ঘটনায় মামলা করা হলে পাল্টা মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।

হামলা শিকার শাবনাজ বেগমের অভিযোগ, তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি, হুমকি ও হয়রানি করা হয়েছে। এমনকি তাদের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে প্রশাসনের ভূমিকা। তাদের দাবি, হামলা ও হুমকির বিষয়ে বারবার জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা গ্রহণ করতেও গড়িমসি করা হয়েছে। অতীতে মামলা গ্রহণের পরও তদন্ত দুর্বল করা কিংবা এমনভাবে চার্জশিট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যাতে অভিযুক্তরা সহজেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ পক্ষ মসজিদের নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টি, জমি দখলের চেষ্টা, মিথ্যা মামলা, গুজব ছড়ানো এবং হামলার মাধ্যমে এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে আসছে। এসব অভিযোগের পরও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

জানা গেছে, মহাদেবপুর পশ্চিমপাড়া এলাকায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণের জন্য নিজ অর্থায়নে জমি কিনেছিলেন প্রবাসী নওশের আলম সুমন। জমি নিয়ে বিরোধের কারণে মসজিদের নির্মাণকাজও দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ।

এদিকে সম্প্রতি শাহিনুর বেগমের বোনের ছেলে মো. আনোয়ার হোসেন ওরফে আজিজুলকে সিলেটের মাধবপুর থেকে ৫৯ কেজি গাঁজাসহ র‌্যাব-৯ আটক করেছে বলে ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, প্রবাসী নওশের আলম সুমন দেশে ছুটিতে ফিরলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তার পরিবারের সদস্যদেরও গুরুতর ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তার স্ত্রী রংপুর সদর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থান করেও তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে নিরাপত্তা ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

এর আগেও দেশে ফেরার পর তাকে হামলার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই প্রবাসী। তার দাবি, একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে লোকজন জড়ো করে পরিকল্পিতভাবে হামলার চেষ্টা করা হয় এবং তার বাড়িতে আগুন দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। পরে যৌথ বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

জমি সংক্রান্ত বিরোধে আদালতের আদেশ নিজেদের পক্ষে থাকার পরও তা অমান্য করে জমিতে প্রবেশ, জমি দখল এবং সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের অভিযোগও করেছেন প্রবাসী নওশের আলম সুমন। তার দাবি, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতার নেতৃত্বে কার্যক্রম স্থগিত আওয়ামীলীগ নেতা রায়হান খান, সিরাজুল ইসলামসহ তাদের সহযোগীরা রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। একের পর এক হামলা, রক্তপাত, হত্যার হুমকি ও জমি দখলের অভিযোগের পরও যদি অপরাধীদের বিরুদ্ধে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘর্ষ বা প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।তাদের আরও দাবি, ভবিষ্যতে পাগলাপীরে কোনো ধরনের সংঘর্ষ, রক্তপাত কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটলে শুধু হামলাকারীদের নয়, অভিযোগ পাওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

প্রিন্ট করুন