ডিজিটাল যুগে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধী শনাক্তে সিসিটিভি ক্যামেরা এখন নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে নিরাপত্তার জন্য স্থাপিত সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। ক্যামেরা রয়েছে, চুরির ঘটনাও ক্যামেরায় ধরা পড়েছে; কিন্তু চোর শনাক্ত করার মতো মানসম্মত ফুটেজ পাওয়া যায়নি। কোনো ক্যামেরা অচল, কোথাও রেকর্ডিং নেই, আবার সচল ক্যামেরার ফুটেজও এত নিম্নমানের যে চেহারা শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে- সিসিটিভির নামে কি শুধু ক্যামেরা বসানোতেই দায়িত্ব শেষ করেছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে? নাকি এসব ক্যামেরা স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে?
ঘটনাটি গত ৬ আগস্ট রাতে। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের বসার স্থান থেকে সাংবাদিক ও লেখক ওসমান গনি (ওসমান এহতেসাম)- এর একটি ব্যাগ চুরি করে নিয়ে যায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি।
ব্যাগটিতে সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহৃত Sony Alpha 7S III (α7S III) Full-Frame Mirrorless Digital Camera ছিল, যার আনুমানিক মূল্য ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ছিল ‘Face the People’ লোগো সংবলিত একটি মাইক্রোফোন, দুটি চার্জার, নগদ ৬১ হাজার ৫০০ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত সামগ্রী।
ঘটনার দিনই চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগকারীর উপস্থিতিতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। রাত ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ফুটেজ উদ্ধারের চেষ্টা চালায় পুলিশ।
দীর্ঘ সময় পর ফুটেজে চুরির দৃশ্য ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি পাওয়া যায়। কিন্তু চেহারা স্পষ্ট না থাকায় তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ওসমান এহতেসামের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ব্যবস্থার একাধিক মনিটর ও ক্যামেরা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, একটি মনিটর সম্পূর্ণ অকার্যকর। অন্য একটি মনিটরে দুটি ক্যামেরার দৃশ্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর রেকর্ডিং কার্যকর ছিল না।
আরেকটি ক্যামেরা সচল থাকলেও সেটির ফুটেজের মান এতটাই নিম্নমানের যে সেখানে থাকা ব্যক্তির মুখ স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ওসমান এহতেসাম বলেন, রেলওয়ে স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থাপনায় নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি বসানো হয়েছে। কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধী শনাক্ত করার সময় যদি ক্যামেরাই কার্যকর না থাকে, তাহলে এসব ক্যামেরার উদ্দেশ্য কী?
তাঁর প্রশ্ন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যামেরা অকার্যকর কেন? নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় কি না? ক্যামেরার রেকর্ডিং ব্যবস্থা কেন সচল ছিল না? আর সচল ক্যামেরার ছবির মান এত নিম্নমানের কেন?
তাঁর অভিযোগ, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু চোরকে খোঁজার পাশাপাশি রেলওয়ের সিসিটিভি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনাও তদন্ত করা প্রয়োজন।
ওসমান এহতেসাম আরও বলেন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে একটি বড় এলাকা। একজন চোর সেখানে প্রবেশ করে চুরি করল। অথচ তাকে শনাক্ত করার মতো কার্যকর কোনো ক্যামেরা পাওয়া গেল না।
তাঁর প্রশ্ন, চোর কি আগে থেকেই জানত কোন ক্যামেরা সচল আর কোন ক্যামেরা অকার্যকর?
তিনি আরও প্রশ্ন করেন, চোর কেন অকার্যকর ক্যামেরার নিচ দিয়ে চলাচল করল, আর সচল ক্যামেরার সামনে দিয়ে গেল না?
এই প্রশ্নের ভিত্তিতে তিনি চোরচক্রের সঙ্গে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান।
তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কারও সঙ্গে চোরের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।
সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু কোনো ক্যামেরা অচল থাকা, কোথাও রেকর্ডিং না থাকা এবং সচল ক্যামেরার ফুটেজও অপরাধী শনাক্তের উপযোগী না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে- ক্যামেরা স্থাপন থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহি ছিল কি না।
কোন প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্যামেরাগুলো স্থাপন করা হয়েছে, ক্যামেরাগুলোর কারিগরি সক্ষমতা কী, কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, ওয়ারেন্টি বা রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি রয়েছে কি না এবং নিয়মিত কারা এগুলো পরীক্ষা করেন- এসব তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সিসিটিভি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও চোরকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। অথচ চুরির ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার সেকেন্ড অফিসার সহদেব কুমার সরকার বলেন, চোর শনাক্তের কাজ এখনো চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যেন চোর শনাক্ত করে মালামাল উদ্ধার করতে পারি।’
তবে পুলিশের হাতে থাকা ফুটেজের মান যদি অপরাধী শনাক্ত করার মতো না হয়, তাহলে তদন্ত কতটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব- সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ওসমান এহতেসামের দাবি, চোরকে ধরতে না পারার দায় শুধু পুলিশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের হাতে যদি পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত ফুটেজ না থাকে, তাহলে তদন্ত কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
তাই তাঁর দাবি, চুরির ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি চট্টগ্রাম রেলওয়ের সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও তদন্ত করতে হবে। কোন ক্যামেরা কত দিন অচল, কেন অচল, কেন রেকর্ডিং পাওয়া যায়নি, ক্যামেরার মান নির্ধারণের সময় কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার- এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।
রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় সিসিটিভি শুধু ক্যামেরা বসানোর বিষয় নয়; সেটি সার্বক্ষণিক সচল রাখা, যথাযথ মানের ভিডিও সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত ফুটেজ উদ্ধার করার সক্ষমতাও নিশ্চিত করার বিষয়।
কিন্তু একজন সাংবাদিকের ব্যাগ চুরির ঘটনায় প্রায় আড়াই ঘণ্টা ফুটেজ উদ্ধারের চেষ্টা করেও যদি শেষ পর্যন্ত অপরাধীর মুখ শনাক্ত করা না যায়, তাহলে রেলওয়ের বর্তমান সিসিটিভি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- সিসিটিভির নামে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও যদি অপরাধী শনাক্তের সময় ক্যামেরা অচল থাকে, রেকর্ডিং না থাকে কিংবা ফুটেজের মান অপরাধী শনাক্তের উপযোগী না হয়, তাহলে এই নিরাপত্তাব্যবস্থার দায় নেবে কে?
চোর এখনো অধরা। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ের সিসিটিভি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে এসেছে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘সিসিটিভি আছে’- এই দাবি দিয়ে রেলওয়ে স্টেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
