হাবিবুর রহমান হাবিব,পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি –
পেশায় পুরোদস্তুর একজন সাংবাদিক হলেও সামাজিক ও মানবিক কাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মো. মফিদুল ইসলাম সরকার। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের অসহায় মানুষ, কৃষক, দরিদ্র পরিবার ও শিশুদের জন্য।
সম্প্রতি স্থানীয় ডোনারদের সহায়তায় তিনি কৃষকদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন সাড়ে তিন লক্ষাধিক টাকার বিভিন্ন সবজির বীজ, সাথে ২০ হাজার বেগুনের চারা ও ৪ হাজার ফুলকপির চারা—সবই বিনামূল্যে। কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব বিতরণ করায় তার এই উদ্যোগ এলাকাজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সাংবাদিক মফিদুল ইসলাম সরকারের বাড়ি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাঠক শিকড় গ্রামে। ১৯৯৮ সালে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। সনদপত্রে নাম মো. মফিদুল ইসলাম হলেও স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘গোলাম আযম’ নামেই বেশি পরিচিত। বর্তমানে তিনি ডেইলি সানের রংপুর জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক নয়া দিগন্তের পীরগাছা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সাংবাদিকতাকে ছাঁপিয়ে তিনি মানবিক ও সামাজিক কাজের জন্যই এখন সবার কাছে এক প্রিয় মুখ।
যেভাবে শুরু তার মানবিক পথচলা
২০০৫ সালে মাত্র একশ টাকার একটি কম্বলের জন্য অসহায় মানুষকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখে ব্যথিত হন তিনি। সেই বছর থেকেই শুরু করেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম। তার ভাষায়— “মানুষ যেন সাহায্যের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট না পায়—এই ভাবনা থেকেই আমার উদ্যোগ শুরু।”
কৃষকদের জন্য নিয়মিত সহায়তা
সবজি বীজ ও চারা বিতরণের পাশাপাশি তিনি এখন স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন সার ও দুই কেজি করে ধানের বীজ প্যাকেটও দিচ্ছেন। এতে অনেক কৃষক নতুন মৌসুমে জমি চাষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পাচ্ছেন।
শিশুদের জন্য সাপ্তাহিক খিচুড়ি ভোজ
প্রতি সপ্তাহেই তিনি বিভিন্ন এলাকার শিশুদের জন্য আয়োজন করেন খিচুড়ি ভোজ। শুধু খাওয়ানোই নয়—শিশুদের আনন্দ দিতে আয়োজন করেন দৌড়, কবিতা আবৃত্তি, কুইজসহ ছোট ছোট প্রতিযোগিতা। অংশগ্রহণকারী সব শিশুকে দেওয়া হয় উপহার সামগ্রী।
শীতবস্ত্র, খাদ্য ও শিক্ষা সামগ্রী উপহার
শীতকালে তিনি অসহায় পরিবারের হাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেন কম্বল ও শীতবস্ত্র। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে একবার শিক্ষা সামগ্রী উপহার দেন। অনেক পরিবারকে দেন চালসহ এক সপ্তাহের বাজার। বিশেষ দিনে আয়োজন করেন মুরগি-পোলাও ভোজ।
পরিবেশ রক্ষায় নতুন উদ্যোগ
পীরগাছা উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছেন তিনি। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশবান্ধব মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
উপকারভোগীদের প্রতিক্রিয়া
অনন্তরাম গ্রামের রহিমা বেগম, হাজেরা বেগমসহ অনেকে জানান, মাসখানেক আগে সাংবাদিক গোলাম আযম লাউয়ের বীজ, শিম, বরবটি দিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো থেকে এখন গাছ হয়েছে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তারা সবজি বিক্রি করে টাকা আয়েরও আশা করছেন।
তারা আরও জানান, গত শীতে সাংবাদিক গোলাম আযম নিজে বাড়ি বাড়ি এসে তাদেরকে কম্বল দিয়েছেন। অনেককে চাল ও বাজার করে দিয়েছেন। এরকম মানুষ সমাজে আরও দরকার।
যাদের সহায়তায় এগিয়ে যাচ্ছে মানবিক উদ্যোগ
মফিদুল ইসলাম জানান, তার এসব মানবিক কাজে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করছেন— কর্নেল (অবঃ) আব্দুল বাতেন, মাওলানা এটিএম আজম খান, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কবি ইলোরা সোমা, নাইজেরিয়া প্রবাসী সুমন চন্দ্র, আলীফ সিডের মালিক বেলাল হোসেন, সার ডিলার রাজন, এগ্রি ফাস্টের মালিক শরিফুল ইসলাম, পটুয়াখালীর ফরহাদ হোসেন শিকদার, ডা. রওশন আরা প্রমুখসহ স্থানীয় আরও অনেক দাতা।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা
মানবিক কাজকে আরও প্রসারিত করতে আগামি ২০২৬ সাল থেকে তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করবেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রীর সাথে একটি করে স্কুল ব্যাগ উপহার দেওয়াসহ আরও নানাবিধ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তিনি। তিনি চান তার মত করে সামর্থ্যবানরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরীব-অসহায়দের বেশি বেশি সাহায্য করুক। যাতে মানুষকে আর সাহায্যের জন্যে অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়।
দাতাদের সহায়তা ও সাংবাদিক মফিদুলের অক্লান্ত পরিশ্রম- দুই মিলে এলাকার অসহায় মানুষের মুখে এখন হাসি ফুটছে প্রতিনিয়ত। তার এই নিরলস মানবিক কার্যক্রম প্রমাণ করে— একজন মানুষ চাইলে পুরো সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
Leave a Reply