“প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে আইন শিক্ষা বাধ্যতামূলক চাই “একটি ন্যায়ভিত্তিক, অধিকার-সচেতন ও সুশাসিত বাংলাদেশ গঠনের জাতীয় প্রস্তাব”আইন না জানা কোনো অজুহাত নয়”—সভ্য বিশ্বের বহুল স্বীকৃত এই নীতিবাক্য (Ignorantia juris non excusat) রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের কাছ থেকে আইন মেনে চলার প্রত্যাশা করে, কিন্তু দুঃখজনক ভাবে অধিকাংশ নাগরিক জীবনের কোনো পর্যায়েই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে আইন সম্পর্কে মৌলিক শিক্ষা লাভের সুযোগ পান না।এর ফলে মানুষ অজান্তেই আইন লঙ্ঘন করেন, প্রতারণার শিকার হন, নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যান এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মামলা-মোকদ্দমা ও সামাজিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।এই বাস্তবতা বিবেচনায় “আইন শিক্ষা আন্দোলন বাংলাদেশ” দৃঢ়ভাবে দাবি জানায়—বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে মৌলিক আইন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।আইন শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট পেশার বিষয় নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা। একজন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, গৃহিণী কিংবা শিক্ষার্থী—সকলেই প্রতিদিন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আইনের আওতায় জীবনযাপন করেন।ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়। আর আইন শিক্ষা শেখায় কীভাবে সেই নৈতিকতাকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে বাস্তবায়ন করতে হয়। তাই একটি আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্রে ধর্মীয়, নৈতিক ও আইন শিক্ষা—এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক।কেন এখনই আইন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজনবাংলাদেশে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভূমি বিরোধ, পারিবারিক বিরোধ, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন, চুক্তিগত বিরোধ এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ছেন। এসব সমস্যার একটি বড় অংশই আইন সম্পর্কে মৌলিক অজ্ঞতার ফল।যদি শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় থেকেই জানতে পারে—বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের মূলনীতি,নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য,ভোক্তা অধিকার,ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতা,নারী, শিশু ও প্রবীণদের আইনগত সুরক্ষা,ট্রাফিক আইন,পরিবেশ সংরক্ষণ আইন,দুর্নীতিবিরোধী নৈতিকতা,সালিশ, মধ্যস্থতা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি,তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল, সচেতন ও ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতাবিশ্বের বহু উন্নত দেশ বহু আগেই বুঝেছে—শুধু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি নয়, আইন সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞানও একজন ভালো নাগরিক তৈরির অন্যতম ভিত্তি।যুক্তরাজ্যে Citizenship Education-এর মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক দায়িত্ব শেখানো হয়।যুক্তরাষ্ট্রে Civics ও Constitution বিষয়ের মাধ্যমে সংবিধান, আদালত ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার পড়ানো হয়।জার্মানিতে সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসন শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব- পূর্ণ অংশ। ফিনল্যান্ডে বাস্তব জীবন- ভিত্তিক নাগরিক শিক্ষা দেওয়া হয়।সিঙ্গাপুরে Character and Citizenship Education-এর মাধ্যমে আইন মান্য করা ও সামাজিক শৃঙ্খলার শিক্ষা প্রদান করা হয়।এই অভিজ্ঞতাগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—আইন শিক্ষা নাগরিককে শুধু আইন মানতে শেখায় না; বরং সমাজকে আরও শান্তিপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক করে তোলে।বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত রূপরেখা প্রাথমিক স্তর সহজ ভাষায় নাগরিক পরিচয়,অধিকার,দায়িত্ব এবং মৌলিক আইন। মাধ্যমিক স্তর বাধ্যতামূলক “আইন ও নাগরিক শিক্ষা” বিষয়।উচ্চ মাধ্যমিক স্তর সংবিধান, মানবাধিকার, প্রশাসনিক কাঠামো ও মৌলিক আইন।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় সকল বিভাগে বাধ্যতামূলক “Introduction to Law” কোর্স। শিক্ষক প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের জন্য আইন সচেতনতা বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ।গণমাধ্যম জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক আইন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও প্রচারণা। প্রত্যাশিত সুফল আইনের শাসনের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পাবে। অপরাধ ও সহিংসতা কমবে।দুর্নীতি প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। ভূমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রতারণা হ্রাস পাবে। নারী, শিশু ও প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা বাড়বে। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে জনগণ আরও প্রস্তুত হবে।অপ্রয়োজনীয় মামলা কমে আদালতের ওপর চাপ হ্রাস পাবে।নৈতিক, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক নাগরিক গড়ে উঠবে। সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।আমাদের আহ্বান আমরা বাংলাদেশ সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC), বাংলাদেশ আইন কমিশন, শিক্ষাবিদ,আইনজ্ঞ,গণমাধ্যম, শিক্ষক, অভিভাবক এবং দেশের সচেতন নাগরিকদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই—জাতীয় স্বার্থে শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে মৌলিক আইন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করুন।একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিক শুধু শিক্ষিত নয়,আইন- সচেতনও হন।আইন শিক্ষা আদালতের জন্য নয়; এটি প্রতিটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনের জন্য। অধিকার জানার পাশাপাশি দায়িত্ব জানাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সময় এসেছে আইন শিক্ষাকে বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক নাগরিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার।আজকের আইন-সচেতন শিক্ষার্থীই আগামী দিনের ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের দায়িত্বশীল নাগরিক।
লেখক
অদম্য গোলাম মোস্তফা
বি.এ,এলএল.বি, এম.এস.এস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
আইন শিক্ষা আন্দোলন বাংলাদেশ।
মোবাইল: ০১৭১১০৫৩৫২৮
ই-মেইল: sgmostofa92@gmail.com
Leave a Reply